![]() |
| ছবি: শাহাজাদ ইসলাম |
একসময় গ্রামবাংলার দুপুর মানেই ছিল এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, আর সেই নিস্তব্ধতা ভেদ করে ভেসে আসা একটানা টুক... টুক... টুক... শব্দ। আমগাছের মরা ডালে বসে ছোট্ট একটি পাখি তার শক্ত ঠোঁট দিয়ে কাঠ ঠোকরাতো অবিরাম।
গ্রামের মানুষ বলতো কাঠঠোকরা ডাকছে। সেই শব্দ শুনেই বোঝা যেত, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলল। কিন্তু এখন? এখন আর সেই শব্দ শোনা যায় না। গ্রামের দুপুরগুলো কেমন যেন বোবা হয়ে গেছে। হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার অতি পরিচিত কাঠঠোকরা পাখি। হারিয়ে যাচ্ছে তার সেই চিরচেনা টুক টুক শব্দ।
কঠঠোকরার পরিচিতি বৈজ্ঞানিক পরিচয়
সাধারণ নাম: কাঠঠোকরা, কাঠটোকরা, কাঠুরে পাখি ইংরেজি নাম: Woodpecker বৈজ্ঞানিক পরিবার: Picidae বর্গ: Piciformes
বৈশিষ্ট্য: শক্ত ছেনি-আকৃতির ঠোঁট, লম্বা আঠালো জিহ্বা, নমনীয় ঘাড়, গাছ আঁকড়ে ধরার মতো নখ এবং শরীরের ভারসাম্য রাখার জন্য শক্ত লেজ।
পৃথিবীতে কত প্রকার?
সারা পৃথিবীতে কাঠঠোকরা পরিবারের প্রায় ২০৪ প্রজাতি আছে।
বাংলাদেশে কত প্রকার?
পাখি গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ২২ প্রজাতির কাঠঠোকরা পাওয়া যায়। এর মধ্যে ২১টি স্থায়ী এবং ১টি পরিযায়ী।
![]() |
| গাছের ডালে কাঠঠোকরা |
বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত কয়েকটি প্রজাতি হলো:
১. বাংলা কাঠঠোকরা: কালো-কোমর সোনালি কাঠঠোকরা বৈজ্ঞানিক নাম: Dinopium benghalense স্থানীয় নাম: Kaththokra গ্রামবাংলায় সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। পিঠ সোনালি, কোমর কালো, মাথায় লাল ঝুঁটি। তোমার ছবিগুলো এই প্রজাতির।
২. ফুলভাস-ব্রেস্টেড কাঠঠোকরা: বৈজ্ঞানিক নাম: Dendrocopos macei স্থানীয় নাম: Pakra Kaththokra / পাকরা কাঠঠোকরা।আকারে মাঝারি, ১৭-২০ সেমি, ওজন ২৫-৪০ গ্রাম। বুক হলদে-বাদামী। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, মায়ানমারে পাওয়া যায়।
৩. লালচে কাঠঠোকরা: বৈজ্ঞানিক নাম:Micropternus brachyurus (আগে Celeus brachyurus) স্থানীয় নাম: Lalchey Kaththokra
৪. বামন কাঠঠোকরা: বৈজ্ঞানিক নাম: Dendrocopos nanus / Picoides nanus স্থানীয় নাম: Ban Kaththokra
৫. পরিযায়ী প্রজাতি: বৈজ্ঞানিক নাম: Jynx torquilla ইংরেজি নাম: Eurasian Wryneck স্থানীয় নাম: Metho Kaththokra এটি শীতকালে বাংলাদেশে আসে।
কোথায় দেখা যায়?
এদের প্রাকৃতিক আবাস হলো: গ্রামের আম, জাম, বট, পাকুড়, কাঁঠাল বাগান পাতাঝরা ও চিরসবুজ বন সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ মধুপুর, ভাওয়ালের শালবন সিলেট ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি বন।
কেন গাছের ডাক্তার বলা হয়?
কারণ এরা গাছের বাকলের ভেতরের ক্ষতিকর পোকা, উইপোকা, পিঁপড়ার ডিম খেয়ে গাছকে বাঁচায়। একটি কাঠঠোকরা দিনে ১০০০ এর বেশি পোকা খেতে পারে।
এই অংশটা তোমার ফিচারের মাঝখানে কাঠঠোকরা আসলে কে?শিরোনামে বসিয়ে দিলে আর্টিকেলটা অনেক বেশি তথ্যবহুল ও গুগলে র্যাংক করবে।
আজকের শিশুরা অনেকেই কাঠঠোকরাকে চেনে না। তারা চেনে ইউটিউবের কার্টুন উডপেকারকে, কিন্তু বাস্তবের, আমাদের গাছে গাছে ঘুরে বেড়ানো লাল-ঝুঁটি, সাদা-কালো ডোরাকাটা সেই পাখিটিকে চেনে না। এটা শুধু একটি পাখি হারিয়ে যাওয়ার গল্প নয়, এটা আমাদের গ্রাম, আমাদের প্রকৃতি, আমাদের শৈশব হারিয়ে যাওয়ার গল্প।
শৈশবের সেই বন্ধু ষাটোর্ধ্ব কৃষক আব্দুল মজিদের কাছে কাঠঠোকরা শুধু পাখি নয়, স্মৃতি। তিনি বলেন,
আগে যখন মাঠে ধান কাটতাম, তখন বটগাছের নিচে বসে জিরাতাম। ওই সময় মাথার ওপর কাঠঠোকরা ঠক ঠক করত। আমরা বলতাম, পাখিটা গাছের পোকা খুঁটে খাচ্ছে। কতক্ষণ যে তাকিয়ে থাকতাম! বাচ্চাদের বলতাম, ওই দেখ কাঠমিস্ত্রি পাখি।
গ্রামের বয়স্কদের বিশ্বাস ছিল, কাঠঠোকরা যে গাছে ঠোকরায়, সেই গাছে ভূত থাকে না। আবার কেউ কেউ বলতো, কাঠঠোকরা ডাকলে বাড়িতে অতিথি আসে। এমন কত মিথ, কত গল্প জড়িয়ে আছে এই ছোট্ট পাখিটিকে ঘিরে।
পাখি গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে প্রায় ১৪ প্রজাতির কাঠঠোকরা দেখা যেত। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো বাংলা কাঠঠোকরা, ছোট সোনালি-পিঠ কাঠঠোকরা, কালো-কোমর বেনেবউ, আর লাল-ঝুঁটি কাঠঠোকরা। লাল টুপি পরা, পিঠে সোনালি রঙ, ঠোঁট যেন ছোট্ট একটা বাটালি দেখতে ভারি সুন্দর।
![]() |
| আমের ডালে কাঠঠোকরা |
কেন হারিয়ে যাচ্ছে?
সরেজমিনে ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়া, আখানগর, ঢোলারহাটসহ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে এবং স্থানীয় বয়স্ক ও পাখিপ্রেমীদের সঙ্গে কথা বলে এর পেছনে ৫টি প্রধান কারণ উঠে এসেছে।
১. বড় গাছের অভাব: বাসস্থানের সংকট: কাঠঠোকরার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, সে পুরনো, বড় এবং মরা গাছে গর্ত করে বাসা বাঁধে। একটি গর্ত করতে তার ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগে। কিন্তু গ্রামে এখন আর বড় গাছ কোথায়? বট, পাকুড়, আম, জাম, কাঁঠালের বিশাল গাছগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে ইটভাটার জ্বালানি বা ফার্নিচারের জন্য। গ্রামে এখন শুধু ইউক্যালিপটাস আর মেহগনির মতো বিদেশি গাছ। যেসব গাছে গর্ত করা যায় না, পোকাও থাকে না। গাছ নেই, তাই বাসাও নেই। বাসা নেই, তাই পাখিও নেই।
২. কীটনাশকের বিষ: কাঠঠোকরার প্রধান খাবার হলো গাছের বাকলের নিচে লুকিয়ে থাকা পোকা-মাকড়, পিঁপড়া ও তার ডিম। কৃষিজমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে সেই পোকাগুলো মরে যাচ্ছে। পোকা খেয়ে পাখিও মরছে। আবার খাবার না পেয়েও মরছে। এটি একটি নীরব বিষক্রিয়া। একজন কৃষক বলেন, আগে গাছে পোকা হলে কাঠঠোকরা এসে খেয়ে যেত। এখন আমরা বিষ দিই। পোকা মরে, সাথে পাখিও মরে।
৩. জলবায়ুর পরিবর্তন: অতিরিক্ত গরম, অনিয়মিত বৃষ্টি, শীতের তীব্রতা কমে যাওয়া সবকিছুই পাখির প্রজনন চক্রে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। ঠিক সময়ে ডিম না ফোটা, বাচ্চা মরে যাওয়া এখন সাধারণ ঘটনা।
৪. মোবাইল টাওয়ার ও শব্দদূষণ: গবেষকরা বলছেন, মোবাইল টাওয়ার থেকে নির্গত রেডিয়েশন পাখিদের দিক নির্ণয় ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। তারা পথ হারিয়ে ফেলে। তাছাড়া গ্রামেও এখন মাইক, মোটরসাইকেল, ইটভাটার প্রচণ্ড শব্দ। সেই শব্দে কাঠঠোকরার টুক টুক শব্দ চাপা পড়ে যায়। পাখিটি ভয় পেয়ে লোকালয় ছেড়ে চলে যায়।
৫. শিকার ও অসচেতনতা: এখনও গ্রামের কিছু কিশোর শখের বশে গুলতি দিয়ে পাখি শিকার করে। তারা জানে না, একটি কাঠঠোকরা বেঁচে থাকলে একটি গাছ বেঁচে থাকে। কারণ সে গাছের ক্ষতিকর পোকা খেয়ে গাছকে সুস্থ রাখে। তাকে বলা হয় "গাছের ডাক্তার"।
প্রকৃতির জন্য কতটা জরুরি এই পাখি?
কাঠঠোকরা শুধু সুন্দর একটি পাখি নয়, সে একজন কৃষক, একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। একটি কাঠঠোকরা বছরে প্রায় কয়েক হাজার কেজি ক্ষতিকর পোকা খেয়ে ফেলে। যে পোকা গাছের ভেতর ঢুকে গাছকে মেরে ফেলে, সেই পোকা সে তার লম্বা জিভ দিয়ে টেনে বের করে আনে।
আরো মজার বিষয় হলো, কাঠঠোকরা নিজের বাসা ছেড়ে দিলে সেই গর্তে বাসা বাঁধে টিয়া, ময়না, চড়ুই, বসন্তবৌরির মতো অন্য পাখিরা। অর্থাৎ, সে অন্য পাখিদের জন্য ঘর তৈরি করে দেয়। সে যদি না থাকে, তাহলে আরো অনেক পাখির বাসস্থানও সংকটে পড়বে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, কাঠঠোকরা হলো ইন্ডিকেটর স্পিসিস। অর্থাৎ, কোনো এলাকায় কাঠঠোকরা আছে মানে বুঝতে হবে সেই এলাকার পরিবেশ এখনো সুস্থ আছে। আর কাঠঠোকরা নেই মানে, পরিবেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। গ্রাম থেকে কাঠঠোকরা হারিয়ে যাওয়া আমাদের জন্য একটি অশনিসংকেত।
ফিরিয়ে আনা যায় কি?
হারিয়ে যাওয়া এই বন্ধুকে কি ফিরিয়ে আনা যায় না? যায়, যদি আমরা চাই।
প্রথমত: গ্রামে পুরনো দেশি গাছ যেমন বট, পাকুড়, আম, জাম, তেঁতুল, কদম কাটা বন্ধ করতে হবে। অন্তত কিছু মরা গাছ রেখে দিতে হবে পাখিদের জন্য।
দ্বিতীয়ত: কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সার ও জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
তৃতীয়ত: শিশুদের মধ্যে পাখি সম্পর্কে ভালোবাসা তৈরি করতে হবে। স্কুলে পাখি চেনার ক্লাস, পাখির ছবি আঁকা, পাখি রক্ষার গল্প বলা যেতে পারে।
চতুর্থত:গ্রামে গ্রামে সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে যে, পাখি শিকার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
শেষ কথা।
দুপুরের নিস্তব্ধতায় কাঠঠোকরার টুক টুক শব্দ শুধু একটি শব্দ নয়, এটি বাংলার গ্রামের আবহমানকালের সুর। এই সুর থেমে গেলে আমাদের গ্রামগুলো ইট-কাঠের শহর হয়ে যাবে, যেখানে প্রাণ থাকবে না।
আজ বিকেলে একবার পুরনো কোনো আমবাগানে গিয়ে কান পেতে দেখুন তো, সেই টুক টুক শব্দটা শুনতে পান কিনা। যদি না পান, তাহলে বুঝবেন, আমরা কতটা নিঃস্ব হয়ে গেছি। আসুন, আমরা সবাই মিলে আবার সেই শব্দটাকে ফিরিয়ে আনি। গাছ লাগাই, পাখিকে ভালোবাসি। কারণ পাখি বাঁচলেই প্রকৃতি বাঁচবে, আর প্রকৃতি বাঁচলেই আমরা বাঁচব।


