![]() |
| ছবি: শাহাজাদ ইসলাম |
গ্রামবাংলার মানুষ একে বলে দুধরাজ, সুলতান বুলবুল, হুসাইনী বুলবুল, কেউ বলে স্বর্গের পরী। নাম শাহ বুলবুল। লম্বা ফিতার মতো লেজ, মাথায় কালো মুকুট, শরীর কখনো ধবধবে সাদা, কখনো গাঢ় কমলা। উড়ে গেলে মনে হয় আকাশে সাদা রুমাল উড়ছে।
এই পাখিকে একবার দেখলে সারাজীবন মনে থাকে। কিন্তু সেই পাখিটিই এখন গ্রামবাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, দিনাজপুরের শালবন, আমবাগান, বাঁশঝাড়ে এখন আর আগের মতো শাহ বুলবুল দেখা যায় না,আর শোনা যায় না জঙ্গলের রাজার বাঁশি।
শাহ বুলবুল আসলে কে? বৈজ্ঞানিক পরিচয়
অনেকেই শাহ বুলবুলকে বুলবুলি ভাবেন, কিন্তু সে বুলবুল গোত্রের পাখি নয়।
সাধারণ নাম: শাহ বুলবুল, দুধরাজ, সুলতান বুলবুল
ইংরেজি নাম: Indian Paradise Flycatcher / Asian Paradise Flycatcher
বৈজ্ঞানিক নাম:Terpsiphone paradisi (Linnaeus,
গোত্র / পরিবার: Monarchidae (রাজন পরিবার)
বর্গ: Passeriformes
গণ: Terpsiphone
অর্থ: Terpsiphone শব্দটি গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে Terpsi মানে আনন্দদায়ক, Phone মানে কণ্ঠ। আর paradisi মানে স্বর্গীয়। অর্থাৎ স্বর্গীয় আনন্দদায়ক কণ্ঠের পাখি"
চেনার উপায়:
শাহ বুলবুলের দুটি রূপ আছে, একে বলে Colour Morph।
১. সাদা রূপ (White Morph): পুরো শরীর ধবধবে সাদা, মাথা কুচকুচে কালো ও ঝুঁটি, লম্বা লেজ ২৪-৩০ সেমি পর্যন্ত, ডানা ও লেজের শেষে কালো দাগ। এটাই রাজা, একে দেখতে সবচেয়ে সুন্দর।
২. লাল / কমলা রূপ (Rufous Morph): শরীরের রঙ গাঢ় কমলা-বাদামী, মাথা কালো, পেট সাদা। সাধারণত স্ত্রী পাখি এবং অল্পবয়সী পুরুষ পাখি এই রঙের হয়।
পুরুষ পাখির লেজ লম্বা ফিতার মতো, স্ত্রী পাখির লেজ খাটো। চোখের চারপাশে নীল রঙের আইলিড, ঠোঁট নীলচে-ধূসর। আকারে চড়ুইয়ের চেয়ে একটু বড়, ১৯-২২ সেমি, লেজ বাদে। লেজ সহ ৩০-৩৫ সেমি।
কোথায় দেখা যায়?
শাহ বুলবুল মূলত এশিয়ার পাখি। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার পর্যন্ত এর বিচরণ। বাংলাদেশে এটি গ্রীষ্মকালীন অতিথি ও আংশিক আবাসিক।
বাসস্থান: ছায়াঘেরা পাতাঝরা বন, আম-লিচু বাগান, বাঁশঝাড়, শালবন, ভাওয়াল-মধুপুর গড়, সুন্দরবনের আশেপাশে, সিলেটের চা-বাগান ও গ্রামের বড় বাগানে।
স্বভাব: খুবই চঞ্চল, এক জায়গায় বেশিক্ষণ বসে না। উড়ে উড়ে পোকা ধরে, তাই একে Flycatcher বলে। ডাক খুব মিষ্টি, চি-চি-চিউ করে বাঁশির মতো শব্দ করে।
![]() |
| সাদা প্রজাতির শাহ্ বুলবুল |
প্রজনন কাল মার্চ থেকে আগস্ট। কাপের মতো সুন্দর বাসা বাঁধে গাছের ডালে, মাকড়সার জাল ও শুকনো পাতা দিয়ে। একবারে ৩-৪টি ডিম দেয়।
কেন হারিয়ে যাচ্ছে? কেন আর দেখা যায় না?
আমি গত ১০ দিনে রুহিয়ার ৫টি গ্রামে খোঁজ নিয়ে ৫ জন বয়স্ক কৃষকের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা সবাই একই কথা বললেন আগে প্রতি বছর বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে এই পাখি দেখতাম, এখন ২-৩ বছরেও একবার দেখি না।
তেমনি একজন প্রবীণ ব্যক্তি বলছিলেন, আমি একসময় প্রতিনিয়ত এই পাখিটি আমার চোখে পরতো কিন্তু বর্তমানে হঠাৎ করেই বিলুপ্ত হয়ে যেতে দেখছি সত্যি বলতে এখন আর আমার চোখে পরেই না। নিজেই হতাস হই কিভাবে বাংলার বুক থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
এর পেছনে ৬টি বড় কারণ রয়েছে:
১. বড় গাছ ও বাঁশঝাড় উজাড়: শাহ বুলবুল কখনো খোলা মাঠে থাকে না। তার জন্য দরকার ঘন, ছায়াযুক্ত বাগান। গ্রামে এখন আম-কাঁঠালের বড় বাগান কেটে মেহগনি-ইউক্যালিপটাস লাগানো হচ্ছে। বাঁশঝাড় কেটে বাড়ি হচ্ছে। বাসা বাঁধার জায়গা নেই।
২. কীটনাশকের আগ্রাসন: শাহ বুলবুলের প্রধান খাবার জীবন্ত পোকা - মশা, মাছি, প্রজাপতি, ছোট ফড়িং। ফসলে অতিরিক্ত কীটনাশক দেওয়ায় এই পোকাগুলো মারা যাচ্ছে। পাখি খাবার পাচ্ছে না। আবার বিষাক্ত পোকা খেয়ে পাখিও মারা যাচ্ছে।
৩. বাসা চুরি ও ডিম নষ্ট: এই পাখির বাসা খুব নিচুতে, মানুষের হাতের নাগালে থাকে। গ্রামের কিছু শিশু-কিশোর শখের বশে বাসা থেকে ডিম, বাচ্চা নিয়ে যায়। কাকও এর বড় শত্রু, সুযোগ পেলেই ডিম খেয়ে ফেলে।
৪. জলবায়ু পরিবর্তন: অতিরিক্ত গরমে এবং অসময়ে বৃষ্টিতে বাসা ভেঙে যায়। প্রজননের সময় নষ্ট হয়।
৫. সৌন্দর্যের অভিশাপ:শাহ বুলবুল দেখতে এত সুন্দর যে, অসাধু পাখি ব্যবসায়ীরা একে ধরে খাঁচায় ভরে বিক্রি করে দেয়। ঢাকা, চট্টগ্রামের পাখির হাটে এই পাখি ২০০০-৫০০০ টাকায় বিক্রি হয়। এটি বন্যপ্রাণী আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
৬. মোবাইল টাওয়ার ও শব্দ: বনের পাশে উচ্চ শব্দে মাইক, ইটভাটা এবং মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশনে এরা বিরক্ত হয়ে গভীর বনে চলে যাচ্ছে।
না বাঁচালে কি হবে? শাহ বুলবুল শুধু সৌন্দর্য নয়, সে প্রকৃতির কীটনাশক। একটি শাহ বুলবুল দিনে প্রায় ২০০-৩০০টি ক্ষতিকর পোকা খেয়ে ফসলের উপকার করে। সে না থাকলে পোকার সংখ্যা বেড়ে যাবে, ফসলের ক্ষতি বাড়বে।
কিভাবে বাঁচানো যায়?
- ১. গ্রামের পুরনো আমবাগান, বাঁশঝাড় সংরক্ষণ করতে হবে।
- ২. পাখির বাসা দেখলে বিরক্ত না করা, বাচ্চাদের বোঝানো।
- ৩. কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে জৈব পদ্ধতিতে চাষ করা।
- ৪. পাখি ধরা ও বিক্রি বন্ধে বন বিভাগকে কঠোর হতে হবে এবং গ্রামে প্রচারণা চালাতে হবে।
- ৫. স্কুলের পাঠ্যবইয়ে এই পাখির ছবি ও গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে।
গত বছর বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শাহ বুলবুলের সংখ্যা গত ১০ বছরে প্রায় ৪০% কমে গেছে। IUCN-এর লাল তালিকায় এখনও এটিকে 'Least Concern' বলা হলেও, স্থানীয়ভাবে এটি বিপন্ন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের সমতল ভূমিতে এরা এখন খুব কমই দেখা যায়।
বর্তমান মানুষের কাছে শাহ বুলবুল শুধু একটি পাখি নয়, এটি ছিল শৈশবের স্মৃতি। বৈশাখের দুপুরে আমবাগানে যখন বাতাসে আমের মুকুলের গন্ধ, তখন হঠাৎ সাদা ফিতার মতো লেজ উড়িয়ে শাহ বুলবুল উড়ে যেত। দাদিরা বলতেন, দুধরাজ দেখা মানে শুভ দিন।আজ সেই বাগানগুলো আছে, কিন্তু দুধরাজ নেই।
গ্রামের একজন প্রবীণ সাংবাদিক বলেন 'শাহ বুলবুল প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। এরা যদি হারিয়ে যায়, তাহলে পোকা-মাকড় বেড়ে যাবে, কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই এদের সংরক্ষণ মানে আমাদের ফসলকে সংরক্ষণ করা।
![]() |
| দুধ রাজ শাহ্ বুলবুল |
তাই এখনই সময়। প্রতিটি গ্রামে একটি করে 'পাখি-বান্ধব বাগান' তৈরি করা যায়, যেখানে বড় গাছ কাটা হবে না, কীটনাশক ব্যবহার হবে না। স্কুলের ছাত্রদের নিয়ে পাখি দেখা কর্মসূচি করা যায়।
শাহ বুলবুল আমাদের গ্রামের অহংকার। লম্বা লেজ উড়িয়ে যখন সে বাগানের ভেতর দিয়ে উড়ে যায়, তখন মনে হয় স্বর্গ থেকে কোনো পরী নেমে এসেছে। এই পরীকে যদি আমরা হারিয়ে ফেলি, তাহলে আমাদের বন-বাগানগুলো সুন্দর থাকবে, কিন্তু প্রাণহীন হয়ে যাবে। তাই আসুন, সবাই মিলে শাহ বুলবুলকে বাঁচাই।
আসুন, আমরা শপথ নিই - আর কোনো শাহ বুলবুলের বাসা ভাঙব না, কোনো বাচ্চাকে খাঁচায় বন্দি করব না। রুহিয়ার আকাশে আবার ফিরে আসুক লম্বা লেজের সাদা পরী। আপনার বাড়ির পাশে যদি এমন পাখি দেখেন, দূর থেকে ছবি তুলুন, বিরক্ত করবেন না এবং বন বিভাগ বা আমাকে জানান।কারণ একটি পাখি বাঁচানো মানে, একটি বনকে বাঁচানো।


