![]() |
| ছবি: শাহাজাদ ইসলাম |
বাংলার নদী,চর,ধানক্ষেত আর কাশবনের ভেতর দিয়ে হেঁটে গেলে একসময় চোখে পড়ত এক ঝাঁক ছোট্ট পাখি, যেন উড়ন্ত আলতা পরী। দূর থেকে কাশফুলের উপর লাল ফোঁটার মতো দেখাতো। গ্রামের মানুষ আদর করে ডাকে আলতা মুনিয়া, রাঙা মুনিয়া, সোনামুনি।
এরই পোশাকি নাম লাল মুনিয়া। ইংরেজিতে Red Avadavat বা Strawberry Finch, বৈজ্ঞানিক নাম Amandava amandava।এই পাখিটি শুধু একটি পাখি নয়, এটি গ্রামবাংলার পরিবেশের সুস্থতার সূচক।লাল মুনিয়া আকারে খুবই ছোট, একটি চড়ুইয়ের থেকেও ছোট। দৈর্ঘ্য মাত্র ৯-১০ সেন্টিমিটার, ওজন ৭-৮ গ্রাম।
একসময় রুহিয়া, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় দিনাজপুর, রংপুর,চর, পদ্মার চর, যমুনার কাশবন সহ বাংলার বুকে ঝাঁকে ঝাঁকে দেখা যেত। আজ চোখে পড়ে না। এই ছোট্ট পাখিটিই বাংলার পরিবেশ কতটা সুস্থ আছে তার সবচেয়ে বড় সূচক। এই পাখি হারিয়ে যাওয়া মানে আমাদের প্রকৃতি অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
পরিচয় ও বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
- জগৎ: Animalia
- পর্ব: Chordata
- শ্রেণী: Aves
- বর্গ: Passeriformes
- পরিবার: Estrildidae
- গণ: Amandava
- প্রজাতি: Amandava amandava
১৭৫৮ সালে লিনিয়াস প্রথম এর নাম দেন Fringilla amandava নামটি এসেছে গুজরাটের আহমেদাবাদ শহর থেকে। একসময় এই শহরের বন্দর থেকে এই পাখি ইউরোপে খাঁচার পাখি হিসেবে রপ্তানি হতো, তাই অপভ্রংশ হয়ে Amandava, আর সেখান থেকে Avadavat নামটি এসেছে।
![]() |
| মা পাখিটি ও বাচ্চা |
বাংলাদেশে মোট ৬ প্রজাতির মুনিয়া পাওয়া যায়। তার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও বিরল হলো এই লাল মুনিয়া।পুরুষ ও স্ত্রী পাখির মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এটি তাদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।
পুরুষ পাখি: (প্রজনন মৌসুমে): গাঢ় টকটকে লাল। বুক, পিঠ, পার্শ্বে সাদা সাদা তিল বা ফোঁটা। ঠোঁট টকটকে সিঁদুরে লাল, চোখের আইরিশ লাল, পা গোলাপি। লেজ কালো। মনে হবে কেউ আলতা দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছে।
স্ত্রী পাখি: অনেকটা অনুজ্জ্বল বাদামি। পিঠ বাদামি, ডানা কালচে। তবে কোমর, ঠোঁটের গোড়া ও চোখের পাশে লাল আভা থাকে। সাদা ফোঁটা পুরুষের তুলনায় অনেক কম।
প্রজননের বাইরে: বর্ষার পর পুরুষ পাখি তার লাল পোশাক হারিয়ে ফেলে, তখন স্ত্রী পাখির মতো বাদামি হয়ে যায়। শুধু লেজের গোড়াটা লাল থাকে। তাই শীতকালে এদের চেনা কঠিন। আরেকটি মজার ব্যাপার হলো ঋতু পরিবর্তনের সাথে ঠোঁটের রঙ বদলায়। মে মাসে লাল হতে শুরু করে, নভেম্বর-ডিসেম্বরে কালচে, আবার এপ্রিলে দ্রুত কালো হয়ে যায়।
কোথায় থাকে? বিস্তৃতি
লাল মুনিয়া ক্রান্তীয় এশিয়ার পাখি। এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি প্রায় ১ কোটি বর্গকিলোমিটার জুড়ে।
বিশ্বে: বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, পাকিস্তান, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, চীন, ইন্দোনেশিয়া।
বাংলাদেশে: একসময় সারা দেশেই ছিল। এখন প্রধানত ঢাকা বিভাগের আফতাবনগর, দিয়াবাড়ি, কেরানীগঞ্জের চর, রাজশাহীর পদ্মার চর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিলেটের হাওর অঞ্চল, যশোর, ফরিদপুরের বিল অঞ্চলে দেখা যায়। এরা জলার কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসে।
![]() |
| লাল মুনিয়া |
এদের প্রিয় জায়গা হলো: নদীর চরের কাশবন, নলখাগড়ার বন, উঁচু ঘাসবন, আখক্ষেত, ধানক্ষেতের আশপাশের ঝোপঝাড়, পরিত্যক্ত ডোবা। যেখানে লম্বা ঘাস আর পানি দুটোই আছে, সেখানেই এরা থাকে। এরা পরিযায়ী নয়, বাংলাদেশের আবাসিক পাখি।
খাদ্যাভ্যাস
এরা মূলত বীজভোজী।এদের প্রধান খাদ্য: ঘাসের বীজ, কাউন, চিনা, শ্যামা ঘাসের বীজ,ধান, তিল, সরিষার বীজ,কাশফুলের বীজ, আগাছার বীজ,প্রজনন মৌসুমে বাড়তি আমিষের জন্য ছোট পোকামাকড়, উইপোকা, শ্যাওলা
ঝাঁক বেঁধে খুব দ্রুত ডানা ঝাপটে উড়ে যায় এবং "চি-চি" বা "সিপ-সিপ" শব্দে ডাকে। এরা একদিকে বীজ ছড়িয়ে বন পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে, অন্যদিকে পোকা খেয়ে ফসলের উপকার করে। আবার নিজেরা ছোট হওয়ায় বাজ, শিকরা, পেঁচার খাদ্য হয়ে খাদ্যশৃঙ্খলের ভারসাম্য রক্ষা করে।
বাসা ও বংশ বিস্তার
লাল মুনিয়ার প্রজনন কাল মে থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, তবে মূলত বর্ষা ও বর্ষার পরপরই, জুন থেকে ডিসেম্বর বেশি সক্রিয়। প্রজনন মৌসুমে পুরুষ পাখি উঁচু ঘাসের ডগায় বসে গান গায়, ডানা ঝাপটায়, লেজ নাড়ায় স্ত্রীকে আকর্ষণ করার জন্য।বাসা বানায় পানির খুব কাছে, নিচু কাঁটা ঝোপে, ঘন ঘাসবনে বা নলখাগড়ার ভেতরে। ঘাস, পাতা, তুলা দিয়ে গোলাকার, অনেকটা ফুটবলের মতো বাসা। বাসার ভেতরে নরম ঘাসের আস্তরণ।
![]() |
| দুইটি লাল মুনিয়া একসাথে |
স্ত্রী পাখি ৪ থেকে ৮টি, কখনো ১০টি পর্যন্ত ছোট সাদা ডিম পাড়ে। ডিম ফুটতে ১২-১৬ দিন লাগে। বাচ্চা ফোটার পর ১৯-২৪ দিনে বাচ্চারা উড়তে শেখে। মা-বাবা দুজনেই মিলে বাচ্চা লালন-পালন করে।এরা সাধারণত ছোট দলে থাকে, ১০-৩০টির ঝাঁক। প্রজননের পর বড় ঝাঁকও দেখা যায়।
গ্রামবাংলা থেকে কেন হারিয়ে যাচ্ছে?
IUCN এর তালিকায় বিশ্বব্যাপী এরা এখনো 'ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত' (Least Concern) হিসেবে আছে, কিন্তু বাংলাদেশে চিত্র ভয়াবহ। গত ১০-১৫ বছরে সংখ্যা ৭০% এর বেশি কমেছে। কারণগুলো:
ক) আবাসস্থল ধ্বংস: এটাই প্রধান কারণ। নদীর চর ভরাট করে প্লট, আফতাবনগর, দিয়াবাড়ি, পূর্বাচলের মতো কাশবন, নলখাগড়ার বন, জলাশয় ভরাট করে অট্টালিকা হচ্ছে। উত্তরা, খিলক্ষেতের কাশবন এখন আর নেই। আখক্ষেত, ধানের জমি কমে যাচ্ছে।
খ) কীটনাশক ও আগাছানাশক: ধান ও ঘাসের বীজে কীটনাশক থাকায় সরাসরি বিষক্রিয়ায় মারা যাচ্ছে। কীটনাশকের কারণে পোকামাকড় কমে যাওয়ায় বাচ্চাদের আমিষের অভাব হচ্ছে।
গ) অবৈধ পাখি ব্যবসা: পুরুষ পাখির লাল রঙের জন্য খাঁচার পাখি হিসেবে চাহিদা আকাশচুম্বী। ঢাকা, কাঁটাবন, মিরপুরের হাটে অবৈধভাবে প্রতিটি পাখি ৫০০-১৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। প্রজনন মৌসুমে পুরো ঝাঁক জাল দিয়ে ধরে ফেলা হয়। এটি সংখ্যা কমার অন্যতম বড় কারণ।
ঘ) জলবায়ু পরিবর্তন: বর্ষার আগাম বন্যায় নিচু ঝোপের বাসা ডুবে বাচ্চা মারা যায়।
![]() |
| এক ঝাঁক লাল মুনিয়া |
আমারা কয়েকটি এলাকায় ঘুরে ঘুরে দেখেছি কিন্তু আর এখন সেই সোনার পাখি লাল মুনিয়ার দেখা পাইনি,লাল মুনিয়ার দেখা করতে করতে কাশবনের মধ্যে একটি শিয়াল দৌড় দিয়ে চলে গেল,আমরা স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানতে পারি, তাঁরাও আর আগের মতো এই লাল মুনিয়া পাখিটি চোখে দেখতে পায় না।
আমি যখন ছোট ছিলাম তখন লাল মুনিয়া পাখিটি প্রায় সময় চোখে পড়তো,দেখতেও ভাল লাগতো,একটি শান্তশিষ্ট খুব আকর্ষণীয় পাখি। আমাদের অবহেলা আবাসস্থল ধ্বংস অবাধ শিকারে আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে এই পাখিটি।
এমনি কিছু কথা বলছিলেন একজন স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি,আরো অনেক জনের মতে এই পাখিটি আর তাদের চোখে পড়ে না। অনেকেই মনে করছেন এখনি যদি সংরক্ষণ এর না উদ্যোগ নেয়া হয় তবে এই পাখিটি বাংলাদেশ থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে, বাংলার বুক থেকে।
কিভাবে রক্ষা করা যায়?
১. ঘাসবন ও জলাশয় সংরক্ষণ: নগরায়নের সময় কিছু প্রাকৃতিক কাশবন, নলবন, ঘাসবন ও জলাশয়কে 'আরবান ওয়াইল্ডলাইফ জোন' হিসেবে রেখে দিতে হবে। ঢাকার আফতাবনগরের মতো জায়গায় পরিকল্পিত সবুজ বেষ্টনী দরকার।
২. কীটনাশক কমানো: জৈব কৃষি, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM) চালু করতে হবে। কৃষকদের বোঝাতে হবে মুনিয়া পাখি ফসলের শত্রু নয়, বন্ধু।
৩. জনসচেতনতা: শিশুদের শেখাতে হবে 'বনের পাখি বনে সুন্দর, খাঁচায় তার জীবন তিলে তিলে শেষ হয়'। স্কুলে পাখি পর্যবেক্ষণ ক্লাব করা যায়।
৪.প্রজনন ক্ষেত্রে নিরাপত্তা: জুন ডিসেম্বর মাসে চরাঞ্চলে ঘাস কাটা, জমি পোড়ানো বন্ধ রাখতে হবে।
আইন কি বলে?
বাংলাদেশে লাল মুনিয়া সংরক্ষিত।বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী লাল মুনিয়া সহ সকল দেশীয় মুনিয়া ধরা, মারা, খাঁচায় রাখা, কেনা-বেচা, পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ।
এই আইনে ধরা পড়লে সর্বনিম্ন ১ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। একই অপরাধ পুনরায় করলে দণ্ড দ্বিগুণ।
বন অধিদপ্তরের ওয়াইল্ড লাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ইউনিট (WCCU) নিয়মিত অভিযান চালায়। কেউ অবৈধভাবে বিক্রি করলে ৯৯৯ বা বন অধিদপ্তরের হটলাইনে জানানো যায়।
IUCN বাংলাদেশ ২০১৫ সালের মূল্যায়নে এদের 'ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত' বললেও, গবেষকরা বলছেন বর্তমান হারে আবাসস্থল হারাতে থাকলে অচিরেই এরা "বিপন্ন" তালিকায় চলে যাবে।
শেষ কথা: লাল মুনিয়া শুধু একটি পাখি নয়, এটি আমাদের শৈশবের কাশবনের স্মৃতি। এই ছোট্ট আলতার ফোঁটাটি যদি হারিয়ে যায়, তবে বাংলার মাঠ তার একটি রঙ হারাবে। সরকারের পাশাপাশি আমাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। একটি ঘাসবন বাঁচানো মানে শত শত লাল মুনিয়ার সংসার বাঁচানো।




