![]() |
| ছবি: শাহাজাদ ইসলাম |
গ্রাম বাংলার পুকুর পাড়ে, ধান ক্ষেতের আইলে বা নদীর খাড়া পাড়ে বসে থাকা ছোট্ট একটা নীল-কমলা পাখি। রোদ পড়লেই মনে হয় যেন হীরে জ্বলছে। এক মুহূর্ত স্থির, পরমুহূর্তেই বিদ্যুৎ গতিতে পানিতে ঝাঁপ। ঠোঁটে ছটফটে মাছ। এই দৃশ্য চেনে না এমন মানুষ বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া ভার। তার নাম মাছরাঙা।
বাংলায় মাছরাঙা শুধু একটি পাখি নয়, এটি আমাদের প্রকৃতি, লোকগল্প আর শৈশবের স্মৃতির অংশ। তবে আমরা যে মাছরাঙাকে সবচেয়ে বেশি দেখি, তার পোশাকি নাম ‘পাতি মাছরাঙা’ বা Common Kingfisher। বৈজ্ঞানিক নাম Alcedo atthis। এই পাখি পরিচিতি পর্বে আজ থাকছে সেই পরিচিত মাছরাঙার গল্প।
চেনার উপায়: ছোট শরীরে রাজকীয় রঙ
পরিচিত মাছরাঙাকে একবার দেখলে ভোলা কঠিন। আকারে খুব ছোট, মাত্র ১৬ থেকে ১৮ সেন্টিমিটার, ওজন ৩০-৪০ গ্রামের মতো, অনেকটা চড়ুই পাখির সমান। কিন্তু রঙের বাহারে সে রাজা।
এর পিঠ, ডানা ও লেজের উপরিভাগ উজ্জ্বল ফিরোজা নীল, রোদে যা সবুজাভ মনে হয়। মাথায় কালচে নীলের ওপর হালকা নীল ছোপ। বুক, পেট এবং গালের নিচের অংশ টকটকে কমলা-তামাটে। গলা ও কানের পাশে সাদা দাগ আছে, যা দূর থেকেও চেনা যায়। ঠোঁট লম্বা, ছুরির মতো ধারালো এবং কালো। পা ছোট, টকটকে লাল।
স্ত্রী ও পুরুষ দেখতে প্রায় একই রকম হলেও একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। পুরুষের নিচের ঠোঁট পুরোটা কালো, আর স্ত্রী পাখির নিচের ঠোঁটের গোড়ার দিকটা কমলা-লাল। এই ছোট্ট পার্থক্য দিয়েই অভিজ্ঞ পাখি পর্যবেক্ষকরা তাদের আলাদা করেন।
![]() |
| এক জোড়া মাছরাঙা বসে আছে। |
বাংলাদেশে কত ধরনের মাছরাঙা?
অনেকে ভাবেন মাছরাঙা মানেই এক রকম। আসলে বাংলাদেশ মাছরাঙার স্বর্গরাজ্য। আমাদের দেশে ১২ প্রজাতির মাছরাঙা পাওয়া যায়।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ধলাগলা বা ধলাবুক মাছরাঙা (White-throated Kingfisher), যাকে আমরা সাধারণত মাছরাঙা বলি। এছাড়া আছে পাতি মাছরাঙা, নীলকান মাছরাঙা, বামন মাছরাঙা বা উদয়ী বামনরাঙা যারা পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট মাছরাঙা, মেঘহও মাছরাঙা (Stork-billed Kingfisher) যারা আকারে প্রায় ৩৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়, পাকড়া মাছরাঙা যারা শূন্যে স্থির হয়ে শিকার করে, খয়রাপাখ মাছরাঙা যারা সুন্দরবনের বাসিন্দা এবং বিরল লাল মাছরাঙা।পরিচিত পাতি মাছরাঙা সারা দেশেই পাওয়া যায়, তবে পরিষ্কার জলের আশেপাশে বেশি থাকে।
বাসস্থান ও স্বভাব: নিঃসঙ্গ শিকারি
মাছরাঙা মূলত জলের পাখি। নদী, খাল, বিল, পুকুর, ধানক্ষেতের ডোবা, এমনকি শহরের লেকেও এদের দেখা মেলে। এরা সাধারণত একা থাকতে পছন্দ করে। নিজের এলাকা নিয়ে এরা খুব সতর্ক। একটি মাছরাঙা একটি নির্দিষ্ট জলাশয়ের পাড়ের একটি ডাল বা খুঁটিকে নিজের ‘ওয়াচ টাওয়ার’ বানিয়ে নেয়। সেখান থেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা শিকারের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকে।
![]() |
| শিকার ধরার আগ মুহূর্তে একশন শুট |
এদের শিকার করার কৌশল অবিশ্বাস্য। জলের এক-দুই মিটার ওপরে বসে থেকে জলের নিচে মাছের নড়াচড়া লক্ষ্য করে। মাছ দেখামাত্র শরীরকে তীরের মতো বাঁকিয়ে সোজা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পানির নিচে চোখ খোলা রাখতে পারে বলে শিকার মিস হয় খুব কম। শিকার ধরেই আবার নিজের ডালে ফিরে এসে মাছটাকে ডালে বাড়ি মেরে অজ্ঞান করে তারপর গিলে ফেলে।
এরা প্রতি ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার বেগে উড়তে পারে। উড়ার সময় তীক্ষ্ণ ‘চি-চি’ শব্দ করে ডাকে।
খাদ্য তালিকা: শুধু মাছ নয়
নাম মাছরাঙা হলেও এরা শুধু মাছ খায় না। ছোট মাছ এদের প্রধান খাদ্য হলেও এরা দক্ষ শিকারি হিসেবে পোকামাকড়, চিংড়ি, কাঁকড়া, ছোট ব্যাঙ, টিকটিকি, এমনকি ছোট সাপও খায়। গবেষণা বলছে, একটি মাছরাঙা দিনে তার শরীরের ওজনের প্রায় ৬০% পরিমাণ খাবার খায়। তাই এদের সারাদিনই শিকারে ব্যস্ত থাকতে হয়।
পরিবেশবিদরা বলেন, মাছরাঙা একটি নির্দেশক পাখি। কোনো জলাশয়ে মাছরাঙা থাকা মানে সেই জলাশয়ের পানি মোটামুটি পরিষ্কার এবং সেখানে ছোট মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য আছে। জলাশয় দূষিত হলে মাছরাঙা সবার আগে সেই এলাকা ছেড়ে চলে যায়।
প্রজনন: মাটির গভীরে ভালোবাসার ঘর
মাছরাঙার বাসা বানানোর গল্পটা সবচেয়ে চমকপ্রদ। এরা গাছে বাসা বানায় না। নদী বা পুকুরের খাড়া মাটির পাড়ে ঠোঁট আর পা দিয়ে সুড়ঙ্গ খোঁড়ে। সুড়ঙ্গটি প্রায় ৩০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়, যার শেষ মাথায় একটি ছোট গোলাকার ঘর থাকে।
![]() |
| বিলে বিদ্যুৎ এর এর তারে বসে আছে |
প্রজননকাল সাধারণত মার্চ থেকে জুন। এই সময় স্ত্রী পাখি ৫ থেকে ৭টি সাদা, গোলাকার ডিম পাড়ে। ডিমে তা দেয় স্ত্রী-পুরুষ দুজনেই। ১৯-২১ দিন পর ছানা ফোটে। ছানারা প্রথমে অন্ধ ও পালকহীন থাকে। বাবা-মা দুজনেই পালা করে তাদের মুখে মাছ এনে খাওয়ায়। প্রায় ২৪-২৫ দিন পর ছানারা উড়তে শেখে।
হুমকি ও সংরক্ষণ: হারিয়ে যাচ্ছে কি রঙিন বন্ধু?
আগে গ্রামে-গঞ্জে প্রচুর মাছরাঙা দেখা গেলেও এখন সংখ্যা কমছে। এর প্রধান কারণ তিনটি।
- প্রথমত, জলাশয় দূষণ। কলকারখানার বর্জ্য, কীটনাশক ও প্লাস্টিকের কারণে পুকুর-খালের মাছ কমে যাচ্ছে। খাবার না পেলে মাছরাঙা বাঁচবে কীভাবে?
- দ্বিতীয়ত, বাসস্থান ধ্বংস। নদীর পাড় বাঁধানো, পুকুর ভরাট এবং খাড়া মাটির পাড় না থাকায় এরা বাসা বানানোর জায়গা পাচ্ছে না।
- তৃতীয়ত, নির্বিচারে শিকার ও ফাঁদ। অনেকে শখের বশে বা মাছ চাষের ক্ষতি করছে ভেবে এদের মারে, যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। মাছরাঙা মূলত রোগা ও ছোট মাছ খায়, চাষের বড় মাছের ক্ষতি করে না।
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে সব প্রজাতির মাছরাঙা সংরক্ষিত। এদের ধরা, মারা বা বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
![]() |
| শূন্য স্থির পাকরা মাছরাঙা বিরল দৃশ্য |
মাছরাঙা আমাদের প্রকৃতির ভারসাম্যের রক্ষক। জলজ পরিবেশ সুস্থ আছে কিনা, তার সবচেয়ে সুন্দর বিজ্ঞাপন এই ছোট্ট নীল পাখিটি। আমাদের জলাশয়গুলো বাঁচলে, পাড়গুলো প্রাকৃতিক থাকলে এই রঙের ঝলকানি আমাদের গ্রাম বাংলায় টিকে থাকবে আরও বহু বছর। পরেরবার পুকুর পাড়ে বসে থাকা নীল-কমলা পাখিটিকে দেখলে একটু সময় নিয়ে দেখুন, আপনি বাংলার সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি দেখছেন।




