![]() |
| ছবি: সংগৃহীত |
এক সময় গ্রামের তালগাছের দিকে তাকালেই চোখে পড়ত ঝুলন্ত শত শত কলসির মতো বাসা। বাতাসে দুলত, ভেতর থেকে কিচিরমিচির শব্দ।
দূর থেকে মনে হতো যেন কোনো দক্ষ কারিগর নিপুণ হাতে বুনে রেখেছে। সেই কারিগর আর কেউ নয়, প্রকৃতির স্থপতি বাবুই পাখি।আজ সেই দৃশ্য প্রায় অতীত। তালগাছ আছে, কিন্তু বাসা নেই। বাসা আছে, কিন্তু পাখি নেই।
হারিয়ে যাচ্ছে শিল্পীর ঘর
বাবুই পাখিকে বলা হয় তাঁতি পাখি। স্ত্রী পাখিকে মুগ্ধ করতে পুরুষ বাবুই তাল, খেজুর আর নারিকেল গাছে বাসা বোনে। একেকটা বাসা বুনতে ১০ থেকে ১৫ দিন লাগে। খড়, তালপাতার আঁশ আর ঘাস দিয়ে তৈরি এই বাসা ঝড়-বৃষ্টিতেও টিকে থাকে।
কিন্তু গত ১০ বছরে ছবিটা বদলে গেছে। কৃষকরা জানালেন, এখন আর আগের মতো তালগাছ কেউ লাগায় না। ইটভাটার জন্য গাছ কাটা পড়ছে, আর নতুন গাছ লাগানো হচ্ছে না। বাবুই যে গাছে বাসা বাঁধবে, সেই গাছই তো নেই।
রুহিয়ার প্রবীণ কৃষক করিম মিয়া বলেন, "আগে আমার বাড়ির পাশের তিনটা তালগাছে ৪০-৫০টা বাসা থাকত। এখন একটা বাসাও নাই। পাখিগুলা কই গেল বুঝি না।"
কেন হারিয়ে যাচ্ছে?
পরিবেশবিদরা বলছেন, বাবুই বিলুপ্তির পেছনে তিনটি কারণ
- ১. আবাসস্থল ধ্বংস: তাল, খেজুর, আখক্ষেত কমে যাওয়া।
- ২. কীটনাশকের বিষ: বাবুই মূলত ধানের পোকা, ফড়িং খায়। জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে সেই পোকা বিষাক্ত হচ্ছে, আর সেই পোকা খেয়ে মরছে বাবুই ও তার ছানা।
- ৩. জলবায়ু পরিবর্তন: অসময়ে বৃষ্টি আর কালবৈশাখী ঝড়ে বাসা ভেঙে ছানা মারা যাচ্ছে।
নীরব হয়ে যাচ্ছে গ্রাম
বাবুই শুধু একটি পাখি নয়, এটি গ্রাম বাংলার সংস্কৃতির অংশ। "বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই" রজনীকান্ত সেনের সেই কবিতা আজও বইয়ে আছে, কিন্তু বাস্তবে বাবুই নেই।
বাবুই কমে যাওয়া মানে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া। বাবুই যে পরিমাণ ক্ষতিকর পোকা খেয়ে ফেলে, তা কোনো কীটনাশক দিয়ে সম্ভব নয়।
এখনো সময় আছে। বাড়ির আঙিনায় একটি তালগাছ লাগালে, জমিতে বিষের ব্যবহার কমালে, হয়তো আবার ফিরে আসবে সেই দুলতে থাকা বাসাগুলো।
নইলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম বাবুই পাখিকে চিনবে শুধু বইয়ের পাতায়, আকাশের দিকে তাকিয়ে আর কোনো দিন দেখবে না সেই নিপুণ শিল্পীর ঝুলন্ত সংসার।
Tags:
ফিচার
